আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

চুড়ি বেচে স্বাবলম্বী শারমিনরা

1459783882584এডিটর ডেস্ক : জীবিকা নির্বাহের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। নুন আনতে পান্তা ফুরায় যাদের, স্বাবলম্বী হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টাটা তাদেরও রয়েছে। এ সমাজে মিনারা বেগম, শারমিন আর লাকী বেগম তাদেরই প্রতিনিধি। শাহবাগ, টিএসসি, কখনও বা বাংলামোটর এলাকায় ফেরি করে কাচের চুড়ি বিক্রি করেন তারা। দিনে আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।

মিনারা বেগমের (৪০) বাড়ি নেই, ছিল না কখনো। নৌকায় ভাসমান জীবন কেটেছে তাদের। জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে। নৌকায় ছাউনি দিয়ে সেই ঘরে বছরের পর বছর পার করেছেন স্বামী পোকা মিয়ার সঙ্গে। মিনারা বেগম বলেন, ‘আমাদের কোনো বাড়ি-ঘর কোনো দিনই ছিলো না। জন্মের পর থেকেই দেখছি বাপ-মা আমাদের নিয়ে নৌকায় থাকতো। ছেলে, সন্তান বড় হইছে। এখন লালবাগে ভাড়াবাসায় থাকি।’ কথা বলে জানা গেল, সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঁচের চুড়ির ব্যবসা করছেন। মাসিক আয় গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। স্বামী পোকা মিয়ার পেশা নদীতে মাছ ধরা। সংসারে আয়ের প্রধান উৎস মাছ বিক্রয় থেকে আসে।

মিনারা বেগম জানান, আগের তুলনায় এখন বিক্রি বেশি, তবে লাভ কম। বিক্রি বেশির পেছনে কারণ রাস্তায় নিয়ন বাতির বদলে সাদা আলোর ব্যবহার। ‘আগে তো হলুদ আলো আছিলো তাই রাইতের বেলা কাচের চুড়ি ব্যাচোন যাইতো না। এখন সুবিধা আছে, যে কোনো রাস্তায় বইসা বেঁচা যায়।’ বলেন মিনারা বেগম। মিনারা বেগম এই ব্যবসা করছেন ১০ বছর ধরে।

লালবাগে থাকেন শারমিন (৩০)। বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। অভাবের তাড়নায় ঢাকা এসেছিলেন বড় বোনের কাছে। সেখানেই পরিচয় হয় মো. রমজানের সাথে। সংসারও হয়েছে কিন্তু অভাব পিছু ছাড়েনি। অভাব ঘোচাতে কাঁচের চুড়ির ব্যবসা শুরু করেন। মো. রমজান কাজ করেন চুড়ির ফ্যাক্টরিতে। টিএসসি শাহবাগ এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন মেলায় এই চুরির দোকান দেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, বৈশাখী মেলা, বই মেলা, আবার শিল্পকলায় বিভিন্ন সময় মেলা বসে, এই সময় বিক্রি একটু বেশি হয়। আবার ঈদের আগে, পূজার আগে বিক্রি বেশি হয়। শারমিনের সাথে কথা বলে জানা গেলো, এই ব্যবসায় বর্তমানে তার পুঁজি ২০ হাজার টাকা।

কাঁচের চুড়ির ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হয়েছে লাকী বেগম। বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুর। তিনি টিএসসি এলাকায় ইদানিং বসছেন। এর আগে কখনও পুরান ঢাকা, নিউমার্কেটের আশপাশের এলাকা, কখনও ধানমন্ডি বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে চুড়ি বিক্রি করতেন। তিনি বলেন, যে সব জায়গায় তরুণ ছেলে-মেয়েদের আনাগোনা বেশি সেসব এলাকায় বেচা-বিক্রি একটু বেশি। লাকী বেগমের স্বামী ফারুক কাজ করেন চুড়ির ফ্যাক্টরিতে। তার পরামর্শেই চুড়ির ব্যবসা শুরু করেন প্রায় ১৫ বছর আগে। ‘তখন বেচা-বিক্রি এখনকার তুলনায় বেশি ছিল। লাভও বেশি হতো। ঘরভাড়া কম ছিল, খাওন খরচও কম ছিল,’ বলেন লাকী বেগম। কথা বলে জানা যায়, কাঁচের এসব চুড়ি সংগ্রহ করেন পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে। টিএসসি এলাকায় বিকেল ৪টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ফুটপাথের উপর দোকান নিয়ে বসেন। এতে তার প্রতিদিন বিক্রি ১ হাজার থেকে ১৫শ’ টাকা। হাজারে তিনশ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকা লাভ হয়’ বলেন লাকি বেগম।

নারী স্বাবলম্বী হওয়ার এই চিত্র নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী পরিষদের নির্বাহী পরিচালক সালমা আলীর সাথে। তিনি উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে হোক আর এমনিতেই হোক নারীকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কাজে অংশ নিতে হবে, তবেই নারীর মুক্তির পথ মিলবে। সমাজে সামাজিক মর্যাদা তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন কেউ নিজে আয় করেন। এ ধরনের নারীকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে ঋণের সুবিধা দেয়া গেলে আরও দ্রুত পটপরিবর্তন হতো বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে সালমা আলী বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, এসব নারী শুধু অক্ষর জ্ঞান আছে। কিন্তু তাদের ভেতরে যে শক্তি আছে তা কাজে লাগাতে দরকার শুধুমাত্র অল্পকিছু পুঁজি আর সামাজিক নিরাপত্তা। এইটুকু ব্যবস্থা করা গেলে সমাজের আর্থিক উন্নয়নে তারা বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে।-বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ