আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

ধামইরহাটের শালবন হতে পারে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান

শালবনআব্দুল মান্নান,নওগাঁ প্রতিবেদক : দেশের উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র ভূমিতে অবস্থিত ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন শালবনের সন্ধান হয়তো অনেকেই জানেন না। নওগাঁ জেলা থেকে ৬০ কিলোমিটার দুরে সীমান্ত ঘেঁষা ধামইরহাট উপজেলার অবস্থান। এ উপজেলায় ২৬৪.১২ হেক্টর এলাকা জুড়ে রয়েছে বরেন্দ্র ভূমির একটি বিশাল প্রচীন শালবন।

শালবনে শুধু শালগাছ নেই পাশাপাশি অন্য গাছেরও দেখা মেলবে। প্রকৃতির অপূর্ব নিদর্শন আর চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের প্রাচুর্য নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চির সবুজের নজর কাড়া সৌন্দর্য অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছে এই শালবন। তাই মন জয় করা এই শালবনে প্রান জুড়াতে আসেন দেশী বিদেশী অনেক পর্যটক। এই বিশাল শালবনকে ঘিরে লুকিয়ে আছে দেশের পর্যটন ক্ষেত্রের বিশাল সম্ভাবনা।

শালবনের পথ যেখানে শেষ সেখানেই ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। কাছাকাছি সীমান্তের পিলার। বেড়ার ওপাড়ে দেখা যায় ভারতীয়দের কৃষিকর্ম আর বিএসএফের টহল। এই বনের অন্যতম আকর্ষন শালগাছকে জড়িয়ে উঠে গেছে হিংলো লতা, অনন্তমূল ও বনবড়ইসহ নানা লতাগুল্ম আর বনফুল। বনের ভেতরে ঢুকতেই নাকে ভেসে আসে নাম না জানা নানা রকমের বনফুলের মিষ্টি গন্ধ। আর মাঝে মাঝে আছে ঘন বেত বন। বেত গাছের সবুজ চকচকে চিকন পাতায় চোখ জুড়িয়ে আসে। এই বনে আছে সাপ, শিয়াল, খরগোস, বনবিড়াল ও বেজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রানী আর পাখি। পাখির কলতানে মুখরিত সমগ্র শালবন।

তবে এখনো যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন ভাল নয়। নওগাঁ শহরের বালুডাঙ্গা বাসষ্ট্যান্ড থেকে ৬০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হবে জেলার ধামইরহাট উপজেলা সদরে। পথে পড়বে মহাদেবপুর, পত্নীতলা উপজেলার সদর। ধামইরহাট থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার পথ পেরুলেই দেখা মিলবে প্রকৃতির আপন খেয়ালে সাজানো নয়নাভিরাম সেই প্রাচীন শালবনটি। ৬ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে লাল মাটির রাঙ্গা পথ। দুরে থেকেই নজরে পড়বে সেই প্রাচীন শালবনটি।

বনের দিকে যতই এগিয়ে যাবেন ততই অনুভূতি হবে রোমাঞ্চকর। পথের ধারে ছোট ছোট বসতবাড়ি সেগুলিতে আদিবাসীদের বসবাস। চোখে পড়বে বরেন্দ্র ভূমির চারিদিকে শুধু উঁচু-উঁচু শালগাছ। ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এই শালবন যেন প্রকৃতির গোপন রহস্যে ঘেরা। এই বনভূমি সরকারের রির্জাভ ল্যান্ড ফরেষ্ট হিসেবে সংরক্ষিত। প্রাকৃতিক এই বনভূমির মাঝে নেই কোন কৃত্রিমতা।

কথিত আছে, পালযুগে পালবংশের কোন এক রানী শালবনটি দেখতে এসেছিলেন। রানীকে কাছে পেয়ে সেখানকার প্রজারা তাদের জল কষ্টের কথা জানায়। কোমল প্রান রানী প্রজাদের ওই কষ্টে ব্যাথিত হয়ে সেখানে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। এটির নামকরন করেন আলতাদিঘি।

বুনোপথ ধরে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখা মিলবে শালবনের মাঝে বিশাল টলটলে জলের আলতাদিঘি। দিঘির এই প্রাকৃতিক বনভূমির চারপাশে ঝোঁপঝাঁড়। প্রকৃতি এখানে নিজ হাতে যেন সবকিছু সাজিয়েছে। তাই এখানে প্রতিদিনই আসে অনেক দুরের প্রকৃতি প্রেমীরা।

আরো কথিত আছে, এক সময় শালবনটির মালিক ছিলেন কলকাতার পাথর ঘাটার জমিদার অত্যানন্দ ঠাকুর। তিনি দৈবক্রমে অন্ধ হয়ে যান। ফলে তার স্ত্রী অক্ষয় কুমারী দেবী জমিদারী পরিচালনা করতেন। উপজেলার আড়ানগরে তাদের কাছারী বাড়ি ছিল (বর্তমানে বাড়িটি তহশিল অফিস হিসেবে ব্যবহ্নত হচ্ছে)। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে প্রতি বছর ৩০ চৈত্র পরিপক্ক শালগাছগুলি নিলামে বিক্রি করতেন। জমিদারের কর্মচারীরা আগেই পরিপক্ক গাছগুলি চিহ্নিত করে রাখতেন। দুর-দুরান্ত থেকে কাঠ ব্যাসায়ীরা প্রকাশ্যে ওই নিলামে অংশ নিতেন। অক্ষয় কুমারীরর উপস্থিতিতে ১৯৪৭ সালে শেষবারের মতো নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে আর সেখানে ঐ জমিদারের কেউ আসেননি। শালবন ২

শালবনের মাঝে জায়গা করে নিয়ে বড় বড় ঢিবি গড়ে তুলেছে উই পোকা। যা নিজের চোখে দেখলেও কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না তবে তা সত্য। লালচে রঙ্গের এই ঢিবিগুলো প্রবল বর্ষনেও নষ্ট হয় না। উই পোকারা নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যায় সারা বছর। শালবনে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সহযোগীতার জন্য ২৪জন জনবল নিয়োজিত রয়েছে সর্বক্ষন।

বর্তমানে এটি পর্যটন কেন্দ্র না হলেও প্রতিদিনই মুখোরিত হয় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারনায়। প্রকৃতির বনভূমি শালবনে কোন বিশ্রমাগার না থাকলেও বনের উত্তর ধারে অনেকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। যারা বেড়াতে আসেন তারা এ ফাঁকা জায়গায় বসে নির্মল বাতাসে আরাম করেন।

শালবনে গেলে চোখে পড়বে চারিদিকে নিঝুম স্তব্ধতা। দু’চোখে শুধুই সবুজ আর সবুজ। কানে আসবে জানা অজানা পাখির ডাক। বরেন্দ্র ভূমির এই প্রকৃতির রাজ্যে যারা আসবেন তাদের মন ভরে উঠবে প্রকৃতির অকৃত্রিম ভালোবাসায়।

বেড়াতে আসা পর্যটক আব্দুর রহিম বলেন, এই স্থানটির কথা আমি বহুবার শুনেছি কিন্তু আসা হয়নি। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না জেলায় এতো সুন্দর একটি শালবন রয়েছে। আর মাঝখানের দিঘিটি শালবনের সৌন্দর্যকে আরো বৃদ্ধি করেছে।

ধামইরহাট উপজেলার দায়িত্বে থাকা বনবিট কর্মকর্তা লক্ষন চন্দ্র ভৌমিক বলেন, বরেন্দ্র ধামইরহাট শালবন পুনুরুদ্ধার ও সংরক্ষন শীর্ষক প্রকল্প ২০১১-১২ অর্থ বছরে জাতীয় উদ্যানের জন্য অর্থ বরাদ্ধ করেছে। ইতোমধ্যে ১৭০ হেক্টর জমিতে ৬৮ হাজার ওষুধি গাছ ও বেত বাগান করা হয়েছে। তাছাড়াও জীববৈচিত্র রক্ষার জন্য এখানে অজগর সাপ ২টি, মেছোবাঘ ৮টি, বনমোরগ ১৪টি, গন্ধগকুল ২টি অবমুক্ত করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এই উপজেলা প্রকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রতিদিন এই শালবন দেখার জন্য শতশত লোকজন আসে। আশা করছি অতি দ্রুত এই জাতীয় উদ্যানের কাজ শুরু হবে। এটি হলে এলাকার চেহারাই পাল্টে যাবে এবং ব্যাপক উন্নয়ন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ