আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

জীবন যুদ্ধে জয়ী সুফিয়ার গল্প

Untitled-1এডিটর ডেস্ক : কর্ম স্পৃহা, উদ্যম, সততা এবং লড়াই করার ক্ষমতা থাকলে যে কোন নারীই হতে পারেন স্বাবলম্বী, হয়ে উঠতে পারেন একটা উদাহরণ। তেমনই একজন সুফিয়া বেগম। একটি হার না মানা জীবনের গল্প। স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্ন তিলে তিলে বাস্তবায়ন করা এক নারীর গল্প। সমাজের আর দশ জন জীবনমুখী নারীর মতোই শ্রম, নিষ্ঠা, সাধনার মধ্য দিয়ে অভাব আর দৈন্যতাকে জয় করে নিত্যদিন সফলতা ছিনিয়ে আনছেন রাজধানীর বাড্ডার আদর্শ নগরের এই সুফিয়া।

২০ বছর আগের কথা। সংসারে অভাবের তাড়নায় বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় সুফিয়াকে। অল্প বয়সেই খুলনার বাবুল শেখের সঙ্গে বিয়ে দেন অসহায় বাবা-মা। গোপালগঞ্জ থেকে স্বামীর বাড়িতে চলে গেলেও খুলনায় আর বেশি দিন থাকা হয়নি এই দম্পত্তির।

জীবনের তাগিদে একেবারেই শূন্য হাতে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু এখানেও বিধি বাম। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো কাজের সন্ধান মেলাতে পারেননি স্বামী বাবুল শেখ। এরই মধ্যে নব এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় ছেলে উজ্জ্বল। শুরু হয় নতুন জীবন যুদ্ধ।

অভাবের সংসারে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাবুল-সুফিয়া। এর মধ্যে কয়েক জায়গায় কাজ পেলেও বেতন অল্প হওয়ায় সংসারের অভাব কোনোভাবেই কাটছিল না তাদের। অবশেষে শত চেষ্টায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ে নিম্ন শ্রেণীর একটি চাকরি মেলে বাবুলের।

তবে দ্রব্যমূল্যের এই বাজারে চাকরির সামান্য বেতনে সংসারের অভাব দূর করা সম্ভব হচ্ছিল না কোনোমতেই। এদিকে ছেলে বড় হয়ে ওঠা নিয়ে চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে সুফিয়ার মনে। দিন যত যায় চিন্তাও তত বেশি বাড়তে থাকে। স্বপ্ন দেখতে থাকেন কিছু একটা করার।

বছর চারেক আগে ভাগ্য বদলের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠেন সুফিয়া। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বাসনা নিয়ে বাড্ডার আদর্শনগরে নিজ বাসার সামনে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে দোকান শুরু করেন তিনি। জীবনের মানে পাল্টাতে থাকেন এই নারী।

শুরু করেন কাপড়ের ব্যবসা। থ্রিপিস, স্কার্ট, ট্রপস, বোরখাসহ নারীদের যাবতীয় পোশাক দোকানে তোলেন তিনি। এছাড়া বিছানার চাদর, বালিশের কাভার, সিট-কাপরসহ পুরুষ ও বাচ্চাদের পোশাকও রাখতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে সেলাইয়ের কাজও রপ্ত করেন তিনি। নিজ দোকানের কাপড় থেকেই পোশাক বানানোও শুরু করেন এক পর্যায়ে।

সময়ের সাথে সাথে পরিচিতিও বাড়তে থাকে এই নারীর। স্বপ্ন-সাধের মধ্যে সংসারের চাহিদাও বাড়তে থাকে। কিন্তু দোকানের আয় সীমিতই থেকে যায়। তবে কেউ স্বপ্ন দেখতে জানলে অভাব পায়ে মাড়িয়ে সে সফলতাও ছিনিয়ে আনতে জানে। তাই কোনো প্রতিবন্ধকতাই দমাতে পারেনি সুফিয়াকে। নিজের পরিচিতি আর সততার মধ্য দিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকেন। স্থানীয় ক্রেতাদের ধরে রাখতে এ সময় ব্যবসার ধরনও পাল্টে ফেলেন তিনি। কাপড়ের দোকানকে মুদি দোকানে পরিণত করেন। থ্রিপিস, স্কার্ট, ট্রপস, বোরখা, বিছানার চাদর, সিট-কাপড়ের বদলে দোকানে চাল, ডাল, আলু, লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ তোলেন। ক্রেতার চাহিদা বিবেচনা করে অন্যান্য মনোহারী পণ্যও ঠাঁই পায় সুফিয়ার দোকানে।

আর এতে করেই বদলে যায় সুফিয়ার ভাগ্যের চাকা। সুফিয়া এখন সাবলম্বী। স্বামীর পায়ে নয়, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অভাব তাড়ানোর প্রতিযোগিতায় তিনি এখন বাড্ডার নারী সমাজের কাছে অনন্য উদাহরণ। ছেলে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার্থী। নিজের ভাগ্য বদলের গল্প প্রসঙ্গে সুফিয়া বলেন, ‘একজন পুরুষের মতো হাত-পা নিয়ে মেয়েরাও জন্ম নেয়। সংসার দু’জনের। দায়ও দু’জনের। একজনের ওপর নির্ভর করলে সংসারে সুখ আসার কথা নয়। জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই ব্যবসা শুরু করেছি। এখন অনেকটাই সফল। দোকানের পরিধি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করাই এখন স্বপ্ন। তবে এ ক্ষেত্রে স্বামীও আমাকে সহযোগিতা করেছেন।’

কথা হয়, সুফিয়া বেগমের স্বামী বাবুল শেখের সঙ্গেও। বলেন, বিয়ের পরে আমাদের সংসারে যে অভাব ছিল, তা যেন ছেলেকে ছুঁতে না পারে এই জন্য ওর (সুফিয়ার) ভাবনার অন্ত ছিল না। ও (সুফিয়া) যখন ব্যবসা করার কথা বলেছে, আমিও সে প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়েছি। সুযোগ পেলে আমিও দোকানে বসি। সংসার তো দু’জনেরই। এটি বুঝতে পারলে সহজেই অভাবকে জয় করা যায়।’- বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ