আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

সার্বিক উন্নয়নে নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন

222এডিটর ডেস্ক : আজকের কন্যা শিশুরা আগামীকালের নারী। সমতা, উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্যসমূহ পরিপূর্ণভাবে অর্জনের জন্য কন্যা শিশুর দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও শক্তির বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। কন্যা সন্তান যেন তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে সেজন্য তাকে সক্ষম করে গড়ে তোলার সহায়ক পরিবেশে প্রতিপালিত হতে হবে। যেখানে তার টিকে থাকা, নিরাপত্তা ও উন্নতির জন্য আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বস্তুগত চাহিদা পূরণ এবং তার সমান অধিকার দিতে হবে। উন্নয়নের প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের সমান অংশিদার করতে হলে এখন থেকেই কন্যা শিশুকে মানুষের মর্যাদা ও মূল্য দিতে হবে। তার মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাগুলো পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার সুযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে থাকবে সেইসব অধিকার যার নিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে শিশু অধিকার বিষয়ক কনভেনশনে। এর সর্বজনীন অনুমোদন একান্ত জরুরি। অথচ দেখা যায় বিশ্বব্যাপী মেয়েদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও হিংস্রতা জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু হয় এবং তা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে সারা জীবন। পুষ্টি, শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের কম থাকে। ছেলেদের তুলনায় তারা শৈশব ও কৈশোরের অধিকার, সুযোগ ও সুফল ভোগ করতে তেমন পারে না। তারা প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের যৌন ও অর্থনৈতিক হয়রানির শিকার হয়।

দারিদ্র্যে বসবাসরত ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ছিটকে পড়া নারীকে উৎপাদনশীল কাজে এবং অর্থনৈতিক মুলধারায় সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভ্যন্তরীনভাবে স্থানান্তরিত নারী যাতে অর্থনৈতিক সুযোগ লাভের পূর্ণ অধিকার পায় এবং অভিবাসী ও শরনার্থী নারীদের গুনাবলী ও দক্ষতা যাতে স্বীকৃত পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীল সম্পদে সমান প্রবেশাধিকার উৎসাহিত করতে হবে। সকল শ্রেণীর বিশেষ করে দারিদ্রে বসবাসরত নারীদের মৌলিক সামাজিক, শিক্ষাগত এবং স্বাস্থ্যগত চাহিদা পুরনের জন্য সরকারী ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক ও ঋন সহায়তার সুযোগ যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির সুবিধাবঞ্চিত নারী উদ্যোক্তারা পায় সে বিষয়েও নজর দিতে হবে।

সারা বিশ্বের প্রত্যেক অঞ্চলেই লিঙ্গ-বৈষম্য বিরাজমান। কন্যা সন্তানের চেয়ে ছেলে সন্তানের প্রাধান্য দেখা যায়। শিক্ষায় ও পেশাগত ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য কম সুযোগ সুবিধা রাখা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে লিঙ্গ বৈষম্য চিহ্নিত করা ও সংশোধন করা তুলনামুলক ভাবে কঠিন। সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য দ্বারা সূচিত নারীকে সামাজিকভাবে কোনঠাসা করে রাখার প্রথা ও বৈষম্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। কারন সামাজিক কাঠামোর মধ্যে নারী ও পুরুষের জন্য ছাচে-ঢালা যে ভূমিকা নির্ধারিত থাকে তাকে সকলেই মেনে নেয় এবং তার বিরুদ্ধে কেউ তেমন প্রতিবাদ করে না।

দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে সর্বোপরি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য লিঙ্গ সমতা বিধান ও নারীর ক্ষমতায়নে অঙ্গিকারবদ্ধ। এজন্য তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। এগুলো হচ্ছে: লিঙ্গ সমতা বিধান বিষয়ক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক শিক্ষা। এই তিনটি ক্ষেত্রে যে উপাত্ত সংগৃহীত হয়েছে তাতে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান। এ অবস্থায় ক্রমাগত উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও এখন পর্যন্ত এক চতুর্থাংশ দেশে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার ১৮টি দেশে ছেলে ও মেয়ের স্কুলে ভর্তির অনুপাত হচ্ছে -১০০: ৮০ অথবা তার নিচে। এশিয়া ও উপ-সাহারীয় আফ্রিকায় এক চতুর্থাংশেরও কম মহিলা অকৃষিকার্যে নিযুক্ত আছে। মধ্যপ্রাচ্যে এ সংখ্যা এক চতুর্থাংশের নিচে। এসকল দেশে জাতিয় সংসদে নারীর আসন মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। লিঙ্গ সমতা বিধান ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হলেও নব্বই দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অকৃষিখাতে মহিলাদের কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে।

আইন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন আনার মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ সমতার জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নারীর সুযোগ ও বেছে নেয়ার সামর্থ্য এখনো সীমিত পর্যায়ে আছে। লিঙ্গ বৈষম্যের কারনে আরো নানা চ্যালেঞ্জ নারীকে মোকাবেলা করতে হয় প্রতিনিয়ত। তারপরও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখন জš§ নেয়া মেয়েদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ১৯৭৯ সালে সিডো সনদ গ্রহণ করার সময়ে জš§ নেয়া মেয়েদের ভবিষ্যতের তুলনায় অনেক বেশী উজ্জল।

বাংলাদেশের সংবিধানে ১০, ১৯, ২৭, ২৮, ২৯ অনুচ্ছেদে নারীর অধিকার সুরক্ষা অর্থাৎ নারীর ক্ষমতায়নের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ প্রণীত নারীর প্রতি সকল বৈষম্য দূরীকরণ সনদ (সিডো) তে অনুস্বাক্ষরকারী একটি দেশ। লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নের জন্য নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে অধিকতর কার্যকর কোন হাতিয়ার নেই। অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে এবং শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমাতে এর মতো কার্যকরী নীতি নেই। স্বাস্থ্য উন্নয়ন সুনিশ্চিত এবং এইডস প্রতিরোধেও নারীর ক্ষমতায়নের কোন বিকল্প নেই। শিশুর শিক্ষার সম্ভাবনা এবং তাদের বিকশিত করার জন্যেও নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। অথচ উন্নয়নশীল দেশ সমুহে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগ করা হয় না।

একটি দেশের অর্ধেক নারী সমাজকে পশ্চাৎপদ রেখে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। রাষ্ট্র ও সমাজের স্বার্থেই নারী সমাজকে উন্নয়নের মুল স্রোতধারায় আনা প্রয়োজন। নারী পুরুষের বৈষম্য দুরীকরনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলকে সম্মলিতভাবে কাজ করতে হবে। -বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ