আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজির মোসাব্বির এখন কোটিপতি

Srimangal pic 4শ্রীমঙ্গল প্রতিবেদক : শ্রীমঙ্গলের এক সফল মানুষ মোসাব্বির আল মাসুদ। যিনি ফিশারি, ডেইরী, পোলট্রি ফার্ম করে এতদঞ্চলে পেয়েছেন ব্যাপক সফলতা। ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে খামার ব্যবসা শুরু করে আজ তিনি মৌলভীবাজার অঞ্চলের একজন সফল খামারী। যিনি পরিণত হয়েছেন এ এলাকার একজন মডেল হিসেবে।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ফার্ম শুরু করে এই কয়েক বছরে এখন তার বিনিয়োগের পরিমাণ দাড়িয়েছে কয়েক কোটি টাকা। শ্রীমঙ্গল উপজেলার হাইল হাওর সংলগ্ন নোয়াগাঁও গ্রামে তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন ‘আল মাসুদ ফিসারী, পোলট্রি এন্ড ডেইরী ফার্ম’। ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত তার এই খামার। এই খামারের মাধ্যমে মোসাব্বির আল মাসুদ নিজে যেমন আর্থিকভাবে সফলতা পেয়েছেন তেমনি এলাকার শতাধিক দরিদ্র বেকার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

খামারটি আরো বর্ধিতকরণের কাজ চলছে বলে জানালেন মোসাব্বির আল-মাসুদ। কাজ সম্পন্ন হলে এই খামারে সহস্রাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

‘আল মাসুদ ফিসারী, পোলট্রি এন্ড ডেইরী’-তে মাছ চাষের জন্য রয়েছে ৩৩টি বিশালাকার পুকুর, ১০০টি শঙ্কর প্রজাতির গরুর খামার, ২টি দেশীয় ও ৪টি লাল জাতের মুরগীর খামারে রয়েছে ১৪ হাজার মোরগ। রয়েছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। সবজির বাগান। বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ।  Srimangal pic 1

বৃহত্তর সিলেটের একমাত্র এই খামারের পুকুরে হচ্ছে দেশীয় পাবদা মাছের চাষ। এছাড়া দেশীয় মাগুর, গুলাইয়াও চাষ হচ্ছে। পুকুরে মাছের খাদ্য তৈরি হচ্ছে তার খামারেই। মোরগের বিষ্টা, গোবর, খৈল, ভূষি, অচোগুড়া, লবন মিশিয়ে খামারের কর্মচারীরাই মাছের খাবার তৈরি করছেন। এ খামার থেকে প্রতি বছর গড়ে ৫ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে। মুরগীর খামারে প্রতিদিন গড়ে ৭ হাজার ডিম হচ্ছে। প্রতিটি ডিমের বর্তমান বাজার মূল্য ৮ টাকা। এতে প্রতিদিন ৫৬ হাজার টাকার ডিম বিক্রি হচ্ছে। ১০০টি শঙ্কর প্রজাতির গরু থেকে প্রতিদিন দুধ পাওয়া যায় ১৪০ লিটার। এ দুধ থেকে ছানা, ক্রীম ও ঘি তৈরি করা হচ্ছে। আরো ৩০০টি গরুর সেড তৈরির কাজ চলছে। কয়েকদিনের মধ্যেই আরো ৪০০টি গরুর বৃহৎ খামার গড়ে তোলা হবে। বর্তমানে ৩৩টি পুকুরে বিভিন্ন জাতের ২৫ লক্ষাধিক মাছ রয়েছে। দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় মাছের চাষ এখানে বেশি হচ্ছে। পাশে আরো কয়েক একর জমি বায়না করা হয়েছে। এগুলোর ক্রয় সম্পন্ন হলে আরো ২৫টির মতো পুকুর খনন করা হবে। ডেইরী খামারে গরুর দুধ দিয়ে নিজস্ব মেশিনে ছানা, ক্রীম ও ঘি প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের সর্বত্র সরবরাহ করা হচ্ছে এসব ছানা ও ঘি। মোরগ রয়েছে ১৪ হাজার। আগামী কিছুদিনের মধ্যে মুরগীর খামারে যুক্ত হবে আরো কয়েক হাজার মুরগী। এতে করে আগামী জুন-জুলাই মাসে ডিমের পরিমাণ দাড়াবে ১২/১৩ হাজার।Srimangal pic 2

‘আল মাসুদ ফিসারী এন্ড ডেইরীর স্বত্ত্বাধিকারী আলহাজ্ব মোসাব্বির আল মাসুদ জানান, ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি পোলট্রি মুরগীর খামার গড়ে তুলেন। কঠোর পরিশ্রম, সফল হবার জন্য প্রচন্ড জেদ-তাকে ধীরে ধীরে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে। প্রথম দিকে দিনের বেলা খামারের মোরগের পরিচর্যা ও রাতের বেশিরভাগ সময় পাহারা তিনি নিজেই দিয়েছেন। যখন কয়েক ব্যাচে সফলতা আসে তখন এক কর্মচারী নিয়োগ দেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে খামারের পরিধি। ২০১১ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের হাইল হাওর সংলগ্ন নোয়াগাঁও গ্রামে কিছু জমি ক্রয় করে গড়ে তুলেন ফিসারী। গত পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে তিনি পান অবিশ্বাস্য সাফল্য।

খামারের সফলতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এক সময় অর্থনৈতিক কষ্টে ছিলাম। ১৯৮৪ সালে নিজ এলাকার অনেক বেকার যুবক মধ্যপ্রাচ্য পাড়ি জমায়। অনেকে আমাকেও প্রবাসে পাড়ি জমানোর জন্য তাগাদা দিতে থাকে। কিন্তু আমি দেশে থেকেই কিছু একটা করে সবাইকে দেখিয়ে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে বাড়িতে মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্রয়লার মুরগীর খামার গড়ে তুলি। দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করি। ধীরে ধীরে সফলতা পেতে থাকি। পরবর্তীকালে আমার খামারের পাশে এসে দাড়ায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। এ ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় (ঋণ) আমি বর্তমান পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছি। আমার আল মাসুদ পোলট্রি, ফিসারী এন্ড ডেইরী ফার্ম সিলেট বিভাগের একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান। এখন এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক বেকার যুবক। তিনি মনে করেন টাকা খরচ করে প্রবাসে গিয়ে চাকুরী না করে সঠিক পরিকল্পনা, সততা, পরিশ্রম থাকলে অল্প পুঁজিতে দেশেই অর্থনৈতিকভাবে সফলতা পাওয়া সম্ভব।  Srimangal pic 3

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই দেশটা সত্যিকার অর্থেই একটি সোনার বাংলা। এ দেশে সোনা ফলে। প্রয়োজন একটু আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনা। সবাই যদি দেশের জমিগুলোর সদ্বব্যবহার করেন তবে এ মাটি থেকে সোনা ফলানো সম্ভব।’

আল মাসুদ ফিসারী, পোলট্রি এন্ড ডেইরী ফার্মের সফলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘আল মাসুদ ফিসারী, পোলট্রি এন্ড ডেইরী পরিদর্শন করে আমি অভিভূত। এ খামারটি এলাকার পুষ্টি ও আমিষের ঘাটতি পূরণে সফলতার সাথে এগিয়ে চলেছে। এ খামারটি সিলেট অঞ্চলের একটি সফল প্রতিষ্ঠান। এ প্রকল্পে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ঋণ হিসেবে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ভবিষ্যতেও ব্যাংকের এ প্রকল্পে সহায়তা অব্যাহত রাখবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ