আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানই তাঁতীদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মজবুত করেন

IMG_20171205_135244মোঃ আঃ খালেক সরকার : বৃটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের প্রারম্ভিক সময়ে বাঙালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুলে প্রাইমারী ও গোপালগঞ্জের মিশনারী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতার ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়াকালীন বাঙালী নেতৃত্বের সান্নিধ্যে থেকে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে ভারত বিভক্তিতে অংশগ্রহন করেন। স্বাধীনতার পর মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে জড়িত থাকাকালীন ১৯৪৯ সনে ২৩ শে জুন আওয়ামী মুসলিমলীগ নামে আলাদা একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হলে, অন্যতম যুগ্মসম্পাদক হিসেবে অন্তর্ভূক্তি হয়ে জাতীয় নেতায় অভিষিক্ত হন। ১৯৫২ এর ভাষাভিত্তিক আন্দোলনে বাঙালীদের আত্ম্হুতি ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায় ১৯৫৪ সনের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিশাল বিজয়ে ও বাঙালীদের স্বার্থ জলাঞ্জলি, আওয়ামী মুসলিমলীগের দলভিত্তিক সাফল্য তথা দেশের সব শ্রেণী পেশার মানুষের অসাম্প্রদায়িক জাগরণকে ধরে রাখার জন্য ১৯৫৫ সনে দল থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগ নাম দিয়ে মূল নেতৃত্বে আসীন হন। পশ্চিমা শাসকদের দুঃশাসনসহ ১৯৫৮ সনের আইয়ুব খাঁনের মার্শাল ‘ল’ বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সনের শিক্ষা আন্দোলন চালানো অবস্থায় এক পর্যায়ে অবহেলিত তাঁতীরাও শেখ মুজিবের আন্দোলন সংগ্রামে সমর্থন যোগায়। কারণ তাঁতীরাও বিশাল ভারতব্যাপী বাজার ব্যবস্থাকে ভুলে ৮০% মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী নেতৃত্বে পূর্ববাংলা শাসনের অভিপ্রায়কে সামনে রেখে সংকুচিত বাজার ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও অধিকতর আশান্বিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় একে তো দু’অংশের মধ্যে বিরাট ভৌগোলিক দূরত্ব, তদুপরি ভাষা সংস্কৃতি কৃষ্টি কালচার পোশাক পরিচ্ছদের কোনো মিল না থাকায় উপরন্ত পশ্চিমাদের শিল্প কারখানা স্থাপনে কর রেয়াতসহ বিভিন্ন সহায়তা দেয়া ইত্যাদি ছিল বড় ধরনের বৈষম্যপূর্ণ চিত্র। অন্যদিকে বাঙ্গালীদের ঘাড়ে বিরাট করের বোঝাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শিল্প কারখানা স্থাপনে ভীতির সৃষ্টি করে। তা ছাড়াও পশ্চিমাদের সঙ্গে এদেশীয় কিছু তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ী তাঁতীদের তৈরি পোশাক শাঁড়ি, লুঙ্গি, গামছাকে ইসলাম পরিপন্থী বা হিন্দুয়ানী পোশাক হিসাবে প্রচারণা চালায়। পরবর্তীতে ‘৬৫’ সনের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ববাংলাকে নিরাপত্তাহীনতা রাখার বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে শেখ মুজিব বাঙালীদের বাঁচার দাবি ৬ দফা পেশ করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের স্বার্থের মতো তাঁতীদেরও আশান্বিত করে তোলে। কারণ ৬ দফায় ট্যাক্সসহ নানাবিধ কর আদায়, দেশী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তি করার বিধান প্রদেশের হাতে সন্নিবেশিত ছিল।

অন্যদিকে ৬ দফা পেশকে কেন্দ্র করে আগরতলা মামলা দায়েরের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ছাত্র জনতার আন্দোলন গণআভ্যূথুানে রুপ নিলে ১৯৬৯ সনে আইয়ুব খান পদত্যাগ করে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান মার্শাল ‘ল’ জারি করে ১৯৭০ সনের জানুয়ারী মাসে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন দিলে পূর্ববাংলায় ৯৮% আসনে জয়ী হয়ে শেখ মুজিব ও তাঁর দল নিরস্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। পরবর্তী ঘটনাসমূহ অতিদ্রুত ঘটতে থাকে। কারণ জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ১লা মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। ৩রা মার্চ পল্টনের জনসভায় শেখ মুজিব কর্তৃক জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা করেন। ৭ই মার্চ পাকসেনা কর্তৃক আহত নিহতদের প্রতিবাদে তথা পরবর্তী ২৬শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার ঘোষণার প্রতিবাদে জনগণকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ ছাড়াও ১৫ই মার্চ আসহযোগ আন্দোলনকে ফলপ্রসূ করার জন্য বঙ্গবন্ধু ২২টি নির্দেশনা জারি করেন। যার ২১ নং নির্দেশনাবলীর (ক) অনুচ্ছেদের ৪নং ধারায় উল্লেখ করেছিলেন তাঁতীরা আবগারী শূল্ক ছাড়াই বাংলা সুতা কিনবেন। মিল মালিক ও ডিলারেরা তাদের কাছ থেকে কোনো আবগারী শূল্ক আদায় করতে পারবে না। ভাবতে অবাক লাগে, বঙ্গবন্ধু এমন সময় ঐ নির্দেশনা জারি করেন যখন সারাদেশময় আন্দোলন সংগ্রামে তাল মাতাল তথা পশ্চিমাদের অশুভ ষড়যন্ত্র, আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনা এমন প্রতিটি উত্তাল মুহুর্তে বঙ্গবন্ধু তাঁতীদের স্মরণে রেখেছেন যা বাঙালী ইতিহাসে বিরল। এই প্রথম বঙ্গবন্ধু সরাসরি তাঁতীদের কথা উল্লেখ করে তাঁতী বন্ধু হিসেবে অভিসিক্ত হন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ প্রাণের আত্মাহুতি ২ লক্ষের অধিক মা- বোনের ইজ্জত ছাড়াও এক অবর্ণনীয় যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতায় শোককে শক্তিতে পরিণত করে বঙ্গবন্ধু বজ্রকঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অতিদ্রুত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। দেশকে পুনর্গঠন ও অনাহারক্লিষ্ট ৭ কোটি মানুষকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার নিমিত্তে অতিদ্রুত ১৯৭২’ এর সংবিধান প্রনয়ণ করে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র এই চারটি মূলনীতি গ্রহণ করেন। এর ধারাবাহিকতায় বাঙালী জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত জাতি ধর্মভেদে মানুষকে সমাজতন্ত্রের অনুশীলণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে মিল কারখানা জাতীয়করণ করে শ্রমিকদের অংশীদারিত্বে অধিক উৎপাদনে উৎসাহিতকরণ, কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কিটনাশকসহ অন্যান্য উপকরণ বিলিকরণ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পৌঁছানোর জন্য ভোগ্যপণ্য সমবায় সমিতি গঠনের অনুমতিদান ছাড়াও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত তাঁতী পরিবার ও তাঁত শিল্প উন্নয়ন করে বস্ত্রের চাহিদা পূরণের জন্য তাঁতীদেরকে ভোগ্যপণ্য উৎপাদকের একক মান হিসেবে চিহ্নিত করে এক সুদূরপ্রসারী ও দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে পাশাপাশি সময়ে ২ টি নির্দেশ জারি করেন।

প্রথমত পাইকারী মূল্যে তাঁতীদের মধ্যে সুতা সরবরাহসহ তাঁত শিল্পের উন্নয়নের ১১ কোটি টাকার ব্যাপক কর্মসূচি ঘোষণা-তারিখ ২২ শে মার্চ ১৯৭২ ইং। দ্বিতীয়ত প্রকৃত তাঁতীদের মধ্যে সুতা পৌছানোর জন্য বিশেষ সেল গঠনের নির্দেশ-তারিখ ৮ ই অক্টোবর ১৯৭২ ইং। উপরোক্ত নির্দেশ জারির পর স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই তাঁতী বন্ধু হিসেবে বঙ্গবন্ধুর তাঁতীবান্ধব বস্ত্রনীতির সুফল তাঁতীদের পক্ষ থেকে কোনো দাবি পেশ করার পূর্বেই প্রথমত সমবায়ের মাধ্যমে ন্যায় মূল্যে সুতা সরবরাহ, দ্বিতীয়ত বিসিকের নিজস্ব অর্থায়নে মিল থেকে সুতা উত্তোলন করে পাইকারী মূল্যে তাঁতীদের মধ্যে সরবরাহ তৃতীয়ত আমদানী লাইসেন্সের মাধ্যমে বিদেশ থেকে তাঁতীরা সুতা রং, কেমিক্যালসসহ তাঁত সরঞ্জামাদি আমদানী করার সুযোগ পায়। তা ছাড়াও সমবায়ের মাধ্যমে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত তাঁতী পরিবারকে পুনর্বাসনের সহায়তায় তাঁত পুনর্বাসন প্রকল্প চালু করে তাঁত ও তাঁত সরঞ্জামাদি সরবরাহের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ইতিহাস সাক্ষী উপরোক্ত তাঁতী সহায়কনীতি সমূহ হাজার বছরেও খুজে পাওয়া যাবে না। ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই এটা সম্ভবপর হয়েছিল। আরো মজার ব্যাপার সামগ্রিক সুতা বন্টনের মূখ্য ভূমিকা পালন করতেন তাঁতী প্রতিনীধিরাই।

উল্লেখ্য, সমবায় ও বিসিক মাসিক ভিত্তিতে অন্যদিকে আমদানী লাইসেন্সে বছরে দু’বার মালামাল আমদানী করার সুযোগ পেতো। মোটামুটি ঐ নীতি ছিল সরকারী কর্মচারীদের অবসরকালীন পেনশন ভোগকারীর মতো।

উপরোক্ত নীতির আলোকে তাঁতীরাও বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্ধ তাঁত চালু করে উৎপাদনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে পারিবারিক যৌথশ্রমে আত্মনিয়োগ করে। দেশ যখন খাদ্য বস্ত্রসহ সবদিকে প্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন বিদেশী রাষ্ট্রসমূহ যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধিতা করেছিল, তারাসহ এদেশীয় নব্য পুঁজিপতি, মজুদদার, মুনাফাখোরসহ স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিসমূহ কৃত্রিমভাবে দূর্ভিক্ষ সৃষ্টি করলেও বঙ্গবন্ধু সরকারের যথোপযুক্ত পদক্ষেপে দূর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সফল হয়। পরবর্তীতে কুচক্রীদের চক্রান্তে যাতে দেশের উন্নয়নে ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য ১৯৭৫ সনের জানুয়ারী মাসে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ গঠন করেন। যা ব্যাপক অর্থে কৃষক শ্রমিক ছাড়াও কামার, কুমার, জেলেসহ বিভিন্ন পেশার জনগণের রাজত্ব কায়েমের প্রত্যয় ঘোষণা করেন। এ থেকে আবশ্যই ধারণা করা যায়, বঙ্গবন্ধ’র ইচ্ছা ছিল বিরটি জনগোষ্ঠী হিসেবে তাঁত পেশায় নিযুক্ত তাঁতীদেরকেও রাজনৈতিকভাবে বিকশিত করার। বঙ্গবন্ধু কাহাকেও হত্যার উদ্দেশ্যে নতুন দল গঠন করেন নাই। অথচ দেশী ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতালোভী চক্রান্তকারীরা রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ইতিহাসের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করে। উল্লেখ্য শাহাদৎ বরণের সময় বঙ্গবন্ধুর পড়নে তাঁতী উৎপাদিত সাধারণ লুঙ্গি ও বঙ্গমাতার পড়নের রক্তমাখা তাঁতী শাঁড়ি-যা এখনো বঙ্গবন্ধু যাদুঘরে সুরক্ষিত আছে। পরিশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু ৪২ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী চলছে।

আমরা যেমন পারি নাই বাঙালী কৃষ্টি কালচারের ধারকবাহক প্রায় ৯০% মানুষের প্রয়োজণীয় পছন্দের শাঁড়ি, লুঙ্গি, গামছাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে। তেমনি পারি নাই বঙ্গবন্ধুর পছন্দের পারিবারিক পোশাক শাঁড়ি, লুঙ্গি, গামছাকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে। অন্যদিকে তাঁতী বন্ধু হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সরকারী সহায়তায় তাঁতীদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্ত ভিতের উপর দাড় করালেও বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বরণের ৪২ বছরে নীরবে নিভৃতে অনেক তাঁতী চোখের পানি ফেললেও তাঁতী সম্প্রাদয়ের পক্ষ থেকে কোনো সমবেদনা প্রকাশিত হয় নাই। তাই জীবনের তৃতীয় ধাপে এসে শুধু বঙ্গবন্ধু হিসেবেই না তাঁতীবন্ধু হিসেবেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতননেছাসহ সকল সদস্যের আত্মার শান্তি কামনা করিছি।

তাঁতী মোঃ আঃ খালেক সরকার

গ্রাম/ডাকঃ- শেরনগর, বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ