আজ : শুক্রবার | ১লা পৌষ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং | ২৭শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

মরা বাড়িতে কান্না যাদের ব্যবসা

rrrrrএডিটর ডেস্ক : অট্টালিকসম ধবধবে সাদা বিশাল বড় বাড়ির সামনে শুয়ে আছেন ঠাকুর সাহেব। পরনে তার কুর্তা আর ধুতি, গলায় ঝোলানো মোটাসোটা স্বর্ণের চেইনের সাথে হনুমানের পেন্ডেন্টটা চোখে পড়ছে খুব। ভীষণ রকম কাশছেন তিনি। কাশির সাথে হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে বুক। আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন বেশ কিছু ভারিক্কী চেহারার লোক, সবার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। শেষ সময় এসে গেছে ঠাকুর সাহেবের। এতোগুলো পরপুরুষের সামনে বের হতে পারছে না বাড়ির মেয়েরা, শেষবারের মতো প্রিয় মুখটা একবার দেখার সুযোগও পাচ্ছে না তারা। এমন করুণ পরিবেশেও বৈষয়িক আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত হয়ে উঠলেন দু-একজন, তাদের প্রধান চিন্তা ঠাকুর মারা গেলে ঐ অঞ্চলের দেখভাল কে করবে? আর ঠাকুর তার পাপ-পুণ্যের হিসেবে নরকের আগুন থেকে রেহাই পাবেন তো?

এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন ঠাকুর, “কী শুরু করলি তোরা! শান্তিতে মরতে দিবি না আমাকে? আমি মরে গেলে তো কান্নাকাটি করার জন্য একটা লোকও কোথাও নেই দেখছি!” উত্তর যেন তৈরিই ছিল, “কেন অযথা চিন্তা করছেন ঠাকুর? রুদালি তো সেই কখন থেকে বসে আছে আপনি মারা গেলে কাঁদতে বসবে বলে!” না, কোনো সিনেমার দৃশ্য নয় এটি, বাস্তবেও ঠিক এমনটাই ঘটতো, বলা ভালো ঘটে চলেছে রাজস্থানে। জীবনের এই কঠিন সত্য অবলম্বনে বরং নির্মিত হয়েছে ডিম্পল কাপাডিয়া অভিনীত, কল্পনা লাজমী পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘রুদালি’।

কালো পোশাক পরিহিত একঝাঁক নারী ঘুরে বেড়াত রাজস্থানময়। কোথাও কেউ মারা গেলে বা মারা যাবে এমন সম্ভাবনা থাকলে আগে থেকে ভাড়া করে রাখা হতো তাদের। তাদের প্রধান কাজ মরা বাড়িতে গিয়ে মাতম করা, বুক চাপড়ে কাঁদা, গাল বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে দেয়া। ভুল করেও সে চোখের পানির একটি কণাও মুছত না তারা, এই প্রথম কারো মৃত্যুতে কাঁদছে না তারা, শেষ কান্নাও নয় এটি। গোটা বাড়িতে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি করতেই তো তাদের ভাড়া করে আনা! এই প্রথা চলেছে শত শত বছর, এখনো চলছে রাজস্থানের বিভিন্ন অজপাড়াগাঁয়ে।

মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে শোকের মাতম করা এই নারীরা সাধারণভাবে পরিচিত ‘রুদালি’ নামে। তাদেরকে বলা হয় ‘প্রফেশনাল মৌনার’ বা পেশাদার বিলাপকারী। বিলাপ করেই জীবিকা নির্বাহ করে তারা। পরনে থাকে কালো পোশাক, যমের পছন্দের রঙ নাকি কালো। তাই মৃত্যুদূতকে খুশি করতে তার পছন্দের সাজেই নিজেদের সজ্জিত করে তারা। সমাজের একেবারে নিচু জাত থেকে তুলে আনা এই রুদালিদের বেশ কিছু সমাজে বিয়ে করারও নিয়ম নেই। নিজের পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে লোকের মৃত্যুতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাঁদবে কে? চেনা নেই, জানা নেই, রক্তের সম্পর্ক নেই; কেবল অর্থের বিনিময়ে মানুষের বাড়িতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থে লোক দেখিয়ে কাঁদার জন্যই যেন জন্ম হয়েছে তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ